ঠিক এক বছর আগে, গত মঙ্গলবার (৮ জুলাই, ২০২৫ সালে) দুপুরে এক চাঞ্চল্যকর দৃশ্যের অবতারণা হয়েছিল কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে। আদালতের স্পষ্ট নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও 'জুলাই শহীদ' হিসেবে গেজেটভুক্ত কবির হোসেনের মরদেহ কবর থেকে উত্তোলন করা সম্ভব হয়নি। পরিবারের তীব্র আপত্তির মুখে প্রশাসন মরদেহ উত্তোলনের কার্যক্রম স্থগিত রেখে ঘটনাস্থল ত্যাগ করতে বাধ্য হয়, যা আইনি প্রক্রিয়া ও মানবিক সংবেদনশীলতার এক জটিল দ্বন্দ্বকে সামনে নিয়ে আসে।
দৌলতপুর উপজেলার কিশোরীনগর গ্রামের বাসিন্দা ও ব্যবসায়ী কবির হোসেন (৫০) ছিলেন ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের এক শহীদ। গত ৫ আগস্ট, ২০২৪ সালে ঢাকার উত্তরা এলাকায় তিনি গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন। পরিবারের দাবি, তিনি বাংলাদেশ সরকারের গেজেটভুক্ত জুলাই শহীদ। নিহত হওয়ার পর ময়নাতদন্ত ছাড়াই তার মরদেহ গ্রামের কিশোরীনগর কবরস্থানে দাফন করা হয়েছিল। পরবর্তীতে, আদালতের নির্দেশনা আসে ময়নাতদন্তের জন্য তার মরদেহ উত্তোলনের। আদালতের নির্দেশ বাস্তবায়নে ঠিক এক বছর আগে সেদিন কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের জুডিশিয়াল মুন্সিখানা ও গোপনীয় শাখার সহকারী কমিশনার এবং নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট জাকিউল আলম, ঢাকা মহানগর পুলিশের উত্তরা পশ্চিম থানার একটি দল, দৌলতপুর থানা পুলিশ এবং উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিকেল অফিসার ডা. এমদাদুল হক টোটন উপস্থিত ছিলেন।
মরদেহ উত্তোলনের জন্য প্রশাসনের কর্মকর্তারা কবরস্থানে পৌঁছালে এক আবেগঘন ও উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। নিহতের স্ত্রী সালমা খাতুন এবং পরিবারের অন্য সদস্যরা মরদেহ উত্তোলনে তীব্র আপত্তি জানান। তাদের দাবি ছিল, স্বামী মারা গেছেন, এখন এত দিন পর মরদেহ তুলে আর কী হবে? তারা কোনো ময়নাতদন্ত চান না। এ সময় তারা কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসকের কাছে মরদেহ উত্তোলন স্থগিতের জন্য একটি লিখিত আবেদনও জমা দেন। পরিবারের এই অনড় অবস্থানের কারণে প্রশাসন তাৎক্ষণিকভাবে কোনো পদক্ষেপ নিতে পারেনি।
নিহতের স্ত্রী সালমা খাতুন সেদিন সংবাদমাধ্যমকে বলেন, 'আমার স্বামী তো মারাই গেছে, এতদিন পর তার মরদেহ কবর থেকে তুলে কী হবে। আমরা ময়নাতদন্ত চাচ্ছি না। এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক বরাবর আবেদন করা হয়েছে।' দৌলতপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খালেদুর রহমানও বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, 'দৌলতপুরের বাসিন্দা কবির হোসেন ঢাকার উত্তরা এলাকায় ৫ আগস্ট নিহত হন। ময়নাতদন্ত ছাড়াই তার দাফন হওয়ায় আদালতের নির্দেশে উত্তরা পশ্চিম থানার পুলিশ নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে মরদেহ উত্তোলনের উদ্যোগ নেয়। তবে পরিবারের আপত্তির কারণে তা সম্ভব হয়নি।'
কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের জুডিশিয়াল মুন্সিখানা ও গোপনীয় শাখার সহকারী কমিশনার এবং নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট জাকিউল আলমও প্রশাসনের অসহায়ত্ব তুলে ধরে বলেন, 'আদালতের নির্দেশ বাস্তবায়নের জন্য আমরা ঘটনাস্থলে গিয়েছিলাম। কিন্তু পরিবারের আপত্তির কারণে মরদেহ উত্তোলন করা সম্ভব হয়নি।' এ ঘটনা একদিকে যেমন বিচারিক প্রক্রিয়ার জটিলতা তুলে ধরে, তেমনি অন্যদিকে পরিবারের গভীর শোক ও সংবেদনশীলতার দিকটিও সামনে এনেছে। জুলাই শহীদ কবির হোসেনের মরদেহ উত্তোলন নিয়ে আইনি ও মানবিক টানাপোড়েন এখনো অমীমাংসিত রয়ে গেছে, যা ভবিষ্যতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।